1. Sohelhota@gmail.com : জি এম ফয়সাল : জি এম ফয়সাল
  2. helalnc22@gmail.com : Helal Uddin : Helal Uddin
  3. daynikbanglarkota@gmail.com : M.O. Telecom : M.O. Telecom
  4. rana016482@gmail.com : মোঃ মাসুদ রানা : মোঃ মাসুদ রানা
  5. miraz55577@gmail.com : মোঃ মিরাজ হোসেন : মোঃ মিরাজ হোসেন
  6. nabsar775@gmail.com : Nurul Absar : Nurul Absar
  7. mdosmank143@yahoo.com : Mohammad Osman : Mohammad Osman
  8. mdosmank143@gmail.com : মোহাম্মদ ওসমান : মোহাম্মদ ওসমান
মঙ্গলবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১০:৫২ পূর্বাহ্ন

বহুদিন পর -গোলোকেশ্বর সরকার।দৈনিক বাংলার কথা অনলাইন।

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেটের সময়ঃ শনিবার, ২১ আগস্ট, ২০২১
  • ২২ বার পড়া হয়েছে

ছোটগল্প
( শর্ট স্টোরি ) বহুদিন পর

গোলোকেশ্বর সরকার

তাং——–২১—৮—২০২১

পনেরো নম্বর পেশেন্ট দু’জন প্রেমিক–প্রেমিকা হাতে প্রেসক্রিপশন নিয়ে পরদা সরিয়ে বেরিয়ে আসতেই মদন ডেকে উঠল, ” অনিকেত তরফদার ——–”
“আছি ।” বলে পেশেন্ট –বসা বেঞ্চ থেকে উঠে দাঁড়াল অনিকেত ও অনুরাধা । মদন হাতে ধরা লিস্টের ষোলো নম্বরে টিক চিহ্ন দিয়ে বলল , “যান । ভিতরে যান ।”
চেম্বারের পরদা সরিয়ে ভিতরে ঢুকল অনিকেত ও অনুরাধা । বুনিয়াদপুর–চেম্বার । চেম্বারের ভিতরে চেয়ারে বসে ছিল ডক্টর বিদিশা সরকার । “নমস্কার ম্যাডাম ।” বলে দু’জনে নমস্কার জানালে ডক্টর বিদিশা বলল, “নমস্কার ।” চেয়ার দেখিয়ে বলল , “বসুন ।” অনিকেত ও অনুরাধা চেয়ারে বসল ।

ডক্টর বিদিশা আই সার্জন । গঙ্গারামপুর হাসপাতালের চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞ । ভাল নামডাক হয়েছে তার ।

ডক্টর বিদিশা মনে করে, সৌন্দর্যকে পরিপূর্ণ ভাবে উপলব্ধি করতে হলে, পূর্ণ ভাবে উপভোগ করতে হলে সুস্থ চোখ থাকা দরকার । চোখ সৌন্দর্য আস্বাদনের অন্যতম মাধ্যম । চোখের প্রতি অবহেলা মানে সৌন্দর্যকে অবজ্ঞা করা , সুন্দরের প্রতি অবিচার করা ।

ডক্টর বিদিশা বলল, ” বলুন ।”
অনিকেত তরফদার বলতে শুরু করল, “ম্যাডাম, বেশ কিছুদিন ধরে আমি চোখে কম দেখছি । ঝাপসা ঝাপসা লাগে সব কিছু । অস্পষ্ট লাগে সব ।”
“ক’দিন ধরে এমন হচ্ছে ?”
“মাসদুয়েক ।”
“দু’চোখেই এমন হয় ?”
” হ্যাঁ ।”
“ডাক্তার দেখিয়েছেন ?”
“না ।” ওনার শরীর খারাপ থাকায় ডাক্তারের কাছে যাওয়া সম্ভব হয়নি ।” অনুরাধা উত্তর দিল ।
“ঠিক আছে । দেখছি ।”
ডক্টর বিদিশা চোখ পরীক্ষার প্রস্তুতি শুরু করল । অনিকেতকে একটি চেয়ারে বসাল । ট্রায়াল বক্স খুলল । চোখে লাগিয়ে দিল ট্রায়াল ফ্রেম । অকলুডার দিয়ে অনিকেতের একটি চোখ বন্ধ করে দিল । সামনে বড় আয়না । পিছনে স্ট্যান্ডে লাগানো ভিশন–চার্ট । চার্টে ইংরেজি বর্ণ A ,B ,C ,D——-X, Y, Z লিখা । স্ট্যান্ডে ঝুলানো সুতো ধরে টানলে ছোট –বড়– মাঝারি আকারের বর্ণগুলো দেখা যায় । আয়নায় দেখে জানাতে হবে পিছনের বিভিন্ন আকারের A, B ,C ,D ——-X ,Y , Z বর্ণগুলো ঠিকঠাক দেখা যাচ্ছে কিনা । এভাবে অন্য চোখেও করা হবে ।

ডক্টর বিদিশা ট্রায়াল ফ্রেমের খোলা চোখে লেন্স লাগিয়ে দিল । অনিকেতকে আয়নার দিকে তাকানোর নির্দেশ দিল । চোখ পরীক্ষা করার জন্য লেন্স লাগানো চোখে অনিকেত আয়নার দিকে তাকাতেই ডক্টর বিদিশার ভিতরটা চঞ্চল হয়ে উঠল । অস্থিরতা ঘিরে ধরল তাকে । কাজে মন লাগছে না । কী ব্যাপার ? এমন কেন ? এরকম তো হয় না । অনেক রোগী দেখেছেন । এমন প্রবলভাবে নড়াচড়া করেনি মন ।

মনকে যতটা সম্ভব সংযত করে দু’টি চোখ পরীক্ষা করল ডক্টর বিদিশা । এরপর স্লিট ল্যাম্প বায়োমাইক্রোস্কোপ –এর সাহায্যে সে দ্বিতীয় পর্যায়ের পরীক্ষা করল । পরীক্ষা শেষে প্রেসক্রিপশন লিখতে লাগল, “নাম ?”
” অনিকেত তরফদার ।”
“বয়স ?”
“চল্লিশ বছর ।”
কলম থামিয়ে জিজ্ঞেস করল, ” আচ্ছা ,আপনার বাড়ি কোথায় ?”
” হরিরামপুর ।” এই জেলা মানে দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার হরিরামপুরে ।”
“হরিরামপুরের কোথায় ?”
“দানগ্রামে ।”
“আপনি কী করেন ?”
“দানগ্রামে আমার একটি ছোট্ট খাতা– কলমের দোকান রয়েছে ।”
“ইনি আপনার কে হন ?”
“আমার স্ত্রী অনুরাধা ।”

আবার কলম ধরল ডক্টর বিদিশা। লেখা শেষ করে বলল , “অনিকেতবাবু , আপনার দুটো চোখেই ছানি পড়েছে । ছানির কারণে আপনি চোখে কম দেখছেন । সবকিছু ঝাপসা ঝাপসা লাগছে । ছানির অপারেশন করাতে হবে । এখন অপারেশন করা না হলে দৃষ্টিশক্তি হারানোর সম্ভাবনা থেকে যাবে । আমি পনেরো দিনের ওষুধ লিখে দিয়েছি । পনেরো দিন পর দেখা করবেন ।অপারেশন করাতে চাইলে সেদিনই আমি আপনাকে অপারেশনের তারিখ বলে দেব ।” ডক্টর বিদিশা অনিকেতের হাতে প্রেসক্রিপশন তুলে দিল ।
অনুরাধা প্রশ্ন করল, ” ম্যাডাম, দুটো চোখের অপারেশন কি একসঙ্গে হবে ?”
“না । একটা চোখের অপারেশন করা হবে আগে । তার দু’– তিন মাস পর অপর চোখের অপারেশন করা হবে । ” ডক্টর বিদিশা উত্তর দিল ।
অনিকেত– অনুরাধা বেরিয়ে যেতেই ডক্টর বিদিশা ডেকে উঠল, ” মদন ।” মদন দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকল । ডক্টর বিদিশা জিজ্ঞেস করল, ” আর ক’জন রয়েছে ?”
মদন উত্তর দিল , “দু’জন ।”
“ওদের বলে দাও এখন আমি আর রোগী দেখব না । শরীর ভাল ঠেকছে না । মন চঞ্চল লাগছে । অস্থির ভিতরটা । কাজে মন দিতে পারছি না । বলে দাও কাল প্রথমেই ওদের দেখব ।” ডাক্তারি জিনিসপত্র গুছিয়ে নিয়ে চেম্বার থেকে বেরিয়ে গেল ডক্টর বিদিশা ।

ডক্টর কুহেলি চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞ । ডক্টর বিদিশার বান্ধবী । ব্যাচ-মেট । একসঙ্গে ডাক্তারি পড়েছে । কুশমন্ডি হাসপাতালের ডাক্তার ।
দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার ছোট্ট জায়গা কুশমন্ডি । ডক্টর বিদিশা বুনিয়াদপুর–চেম্বার থেকে গঙ্গারামপুর কোয়ার্টারে গেল । সেখানে কিছু সময় বিশ্রাম করে , নিজের পরীক্ষা- নিরীক্ষা করিয়ে সোজা প্রাইভেট গাড়ি চালিয়ে ডক্টর কুহেলির কাছে পৌঁছাল । গঙ্গারামপুর থেকে কুশমন্ডির দূরত্ব প্রায় তিরিশ কিলোমিটার । পৌঁছাতে বেশি সময় লাগল না ।ডক্টর কুহেলি বলল, ” কীরে , তুই এখন ? এই অসময়ে ?” বিদিশা চেয়ারে বসল । হাতের স্মার্টফোন টেবিলে রাখল । বলল, “বুঝলি কুহেলি, কেন জানি না আজ এক পেশেন্টকে পরীক্ষা করার সময় আমার ভিতরটা হঠাৎ ভীষণ রকম চঞ্চল হয়ে উঠল । অস্থির হয়ে পড়ল ।কিছুতেই কাজে মন দিতে পারছিলাম না । বুঝতে পারছিলাম না কেন এমনটা হচ্ছিল । এখনও সেই অস্থিরতা কাজ করছে আমার মধ্যে ।”

“বিয়ে কর, বিয়ে কর । বিয়ে করলে এমন অনেক চঞ্চলতা, এমন অনেক অস্থিরতা দূর হয়ে যাবে ।” ডক্টর কুহেলি বলে হাসল ।
“ইয়ার্কি করিস না তো ?”
পাশে বসে কানের কাছে মুখ এনে ডক্টর কুুুুুুুুুুহেলি বলল ,” অরুণাভর সঙ্গে দেখা হয়নি বুঝি ? অরুনাভ ও ডক্টর বিদিশা একই হাসপাতালের ডাক্তার । অরুণাভ চাইল্ড স্পেশালিস্ট । বিয়ে করেনি এখনও ।
“আবার ইয়ার্কি ।”
হাসি থামিয়ে ডক্টর কুহেলি সিরিয়াস হয় । বলে, “ব্লাড –প্রেসার ঠিক আছে তো ?”
“হ্যাঁ । মেপে দেখেছি ১২০/৮০ ”
” হার্টের দোষ নয়তো ?”
“না । ইসিজি করিয়েছি । দেখলাম, হার্ট ঠিক আছে ।”
“কোনও দুশ্চিন্তা ছিল কি মনের মধ্যে ?
” না ।”
“পেশেন্টের নাম কী ?”
” অনিকেত তরফদার । সাথে তার স্ত্রী ছিল । নাম– অনুরাধা ।”
ডক্টর কুহেলি সিরিয়াস হয়ে বলল, ” হয় । হয় । অনেক সময় এমন হয় । ডাক্তাররা রোগীর সেবাকেই প্রধান কর্তব্য বলে মনে করে । রোগীর কল্যাণকেই পরমব্রত মনে করে । নিজেদের কথা একরকম ভুলেই যায় । নিজেদের যে শরীর আছে , শরীরেরও যে বিশ্রাম দরকার সেটা মনে আনে না কখনও । বিশ্রামের অভাবে শরীর কখনও কখনও অস্থির হয়ে পড়ে , চঞ্চল হয়ে ওঠে । ওটা নিয়ে অত ভাবার কিছু নেই । তাছাড়া এখন গ্রীষ্মকাল । প্রচন্ড গরম পড়েছে ।গরমেও এমনটা হতে পারে । ঠান্ডা খা । ভিতরটা ঠান্ডা হয়ে যাবে । বিশ্রাম নে । দেখবি সব ঠিক হয়ে গেছে ।” সেদিন সারাটা দিন ডক্টর কুহেলির কাছে কাটিয়ে দিল ডক্টর বিদিশা ।

ডক্টর বিদিশার বাড়ি উত্তর দিনাজপুর জেলার রায়গঞ্জ দেবীনগর । তিন বছর ধরে গঙ্গারামপুর হাসপাতালে কর্মরতা । কোয়ার্টারে থাকে । বিয়ে হয়নি । ছেলে দেখাদেখি চলছে । ডক্টর বিদিশার বাবা-মা রায়গঞ্জে থাকেন । তারাই পাত্র-পাত্রী দেখাদেখি করছেন । তাদের বক্তব্য, বিয়ে না করলে জীবন অসম্পূর্ণ মনে হয় , অপূর্ণতা থাকে জীবনে । তবে এখনই বিয়ে করতে রাজি নয় ডক্টর বিদিশা । নিজের পেশা নিয়েই ব্যস্ত থাকে সে ।
ডক্টর বিদিশা একটা কাজের মেয়ে রেখেছে । নাম– রেনুকা । রেনুকা রান্না করে দিয়ে বাড়ি চলে যায় । রেনুকা বলল, ” দিদিমণি, আমি চললাম । রান্না করা খাবার ঢাকা রয়েছে । খেয়ে নিও ।”
” ঠিক আছে । তুই যা ।”

খাওয়া-দাওয়া সেরে বিছানায় গা এলিয়ে দিল বিদিশা । কিছুতেই ঘুম আসছে না । এপাশ-ওপাশ করে । কী ব্যাপার ? ঘুম আসছে না কেন ?ঘুমের সমস্যা তো ছিল না । কেন এমন হচ্ছে ?কেন বারবার মন বলছে —‘রুদ্রনীল ‘। ‘রুদ্রনীল ‘।

বিদিশা আলমারি থেকে ফটো অ্যালবাম বের করল । রুদ্রনীলের ছবি বের করে তাতে হাত রাখল । বিদিশার মনে পড়ে গেল পুরনো দিনের কথা । রুদ্রনীল ও বিদিশা একই কলেজে পড়ত । রায়গঞ্জ ইউনিভার্সিটি কলেজ । রুদ্রনীল আসত রায়গঞ্জ কর্ণজোড়া থেকে , বিদিশা আসত রায়গঞ্জ দেবীনগর থেকে । রজতাভ রুদ্রনীলের অন্তরঙ্গ বন্ধু । কিছুদিন ধরে রায়গঞ্জে গরম চলছিল ।গরমে হাঁসফাঁস লাগছিল । মুখ– হাত– পা জ্বালা করছিল । আবহাওয়া দপ্তর পূর্বাভাস দিয়েছিল আগামি চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে বৃষ্টি হবার সম্ভাবনা । বিদিশা কলেজ থেকে বাড়ি ফেরার পথে চশমার দোকানে ঢুকেছিল রোদ–চশমা কেনার জন্য । সাথে প্রিয় বান্ধবী অদ্রিজা । বিদিশা ও অদ্রিজা ছাতা মাথায় বাড়ি ফিরছিল । আবহাওয়া দপ্তরের পূর্বাভাস মতো রাস্তার মধ্যে ঝমঝম করে বৃষ্টি নেমে এসেছিল । হাওয়াতে বিদিশার হাত থেকে ছাতা উড়ে গিয়েছিল । বৃষ্টির ফোটায় গা জুড়িয়ে গিয়েছিল বিদিশার । বিদিশা ছাতা ধরার জন্য কিছুটা চেষ্টা করার পর ছাতা ডিগবাজি খেতে –খেতে চলে যাচ্ছিল দেখে আর ছাতা ধরার চেষ্টা করেনি । বৃষ্টিতে ভিজছিল বিদিশা । আহ , কি আরাম ! অদ্রিজা চিৎকার করে ডেকে উঠেছিল ,”বিদিশা , অ্যাই বিদিশা, বৃষ্টিতে ভিজিস না । জ্বর চলে আসবে । সর্দি-কাশি হবে । শরীর খারাপ হবে ।”
কে শোনে কার কথা ? বৃষ্টির ফোঁটা অনবরত পড়ছিল বিদিশার দেহে । বৃষ্টির জলে ভিজছিল বিদিশার প্রতিটি অঙ্গ । নিজেকে সম্পূর্ণভাবে ভিজিয়ে ফেলেছিল বিদিশা । ভিজে সপসপে । ব্যর্থ হয়ে গিয়েছিল অদ্রিজা । শুধু বিদিশা কেন বেশিরভাগ মেয়েই নিজের শরীরকে একবার না—-একবার বৃষ্টির জলে ভিজিয়ে নিতে চায় ।

আশঙ্কামতো সেদিন রাতে জ্বর চলে এসেছিল বিদিশার । একশো চার জ্বর । সঙ্গে সর্দি-কাশি ।
মাথায় জল ঢালা, কপালে জলপট্টি কিছুতেই কিছু হচ্ছিল না । শঙ্কিত হয়ে ডাক্তার ডাকতে গিয়েছিল বিদিশার বাবা । ভুল বকতে শুরু করেছিল বিদিশা । ভুল বকতে বকতে বিদিশার মুখ দিয়ে বেরিয়ে এসেছিল একটি নাম —- ‘রুদ্রনীল ।”
সেদিনই প্রথম বিদিশা ও তার পরিবার জানতে পেরেছিল রুদ্রনীল বিদিশার দেহে বাসা বেঁধেছে । জ্বর বিদিশার ভিতরকে সকলের সামনে এমন উন্মুক্ত করে দেবে, বৃষ্টি বিদিশাকে সবার সামনে এমন অনাবৃত করে দেবে বিদিশা কখনও ভাবতে পারেনি । অদ্রিজার নিষেধ মনে পড়ছিল বারবার ।

কলেজ গেটের সামনে চায়ের দোকানে রুদ্রনীল দাঁড়িয়ে ছিল । রজতাভ চায়ের দোকানের বেঞ্চে বসে মোবাইল ঘাটছিল । রুদ্রনীল রজতাভের মোবাইল ঘাটা দেখে বলল, “যদিও এটা মোবাইলের যুগ ,তবে প্রেম নিবেদনে মোবাইলের থেকে হাতে- লেখা চিঠি অনেক বেশি ভাল । হাতে- লেখা -প্রেমপত্রের বিকল্প হয় না ।
“কেন ?” রজতাভ প্রশ্ন করেছিল ।
রুদ্রনীল বলেছিল, ” মোবাইলে প্রেম– নিবেদনে প্রাণ থাকে না । যান্ত্রিক মনে হয় । কৃত্রিম ।”
রজতাভ বলেছিল, ” কিন্তু লোকে তবুও মোবাইলে প্রেম নিবেদন করছে ।”
রুদ্রনীলের উত্তর, ” করছে । তবে আমার কাছে কাগজে লেখা প্রেমপত্রই শ্রেষ্ঠ । অকৃত্রিম ।কাগজের প্রেমপত্রে প্রাণের স্পর্শ পাওয়া যায়, প্রাণের গন্ধ, প্রাণের সান্নিধ্য অনুভূত হয় । দু’টি প্রাণের নৈকট্য অনুভূত হয় ।”

বিদিশা কলেজ থেকে বের হচ্ছিল । পাশ দিয়ে বিদিশা বেরিয়ে যেতেই রুদ্রনীলের মুখ দিয়ে অস্ফুটে বের হয়েছিল , ” উফ ! বিউটিফুল ! খুব সুন্দর ! ”
বিদিশা চলে যেতেই রুদ্রনীল রজতাভকে জিজ্ঞেস করেছিল, ” কে রে মেয়েটি ?
রজতাভ বলেছিল, ” বিদিশা । বিদিশা সরকার ।ফার্স্ট ইয়ারের ছাত্রী । কেমেস্ট্রি অনার্স । আমাদের থেকে এক- ক্লাস নিচে পড়ে ।পড়াশোনায় খুব ভাল । কোনও ছেলেকে পাত্তা দেয় না ।”
“তাই ! তাহলে তো দেখতে হয় ব্যাপারটা ।” রুদ্রনীল বলেছিল । রুদ্রনীল বটানি অনার্সের ছাত্র ।
রজতাভ বলেছিল, ” রুদ্রনীল, বিদিশাকে তুই যদি প্রেমের প্রস্তাব দিতে পারিস , তাহলে পেট ভরে তোকে বিরিয়ানি খাওয়াব ।” বিরিয়ানি রুদ্রনীলের প্রিয় খাবার ।
” বাজি ?”
” হ্যাঁঁ , বাজি ।”
“ঠিক আছে । কাল দেখিস ।”

পরদিন রুদ্রনীল নিজের হাতে একটি প্রেমপত্র লিখে নিয়ে এসেছিল । বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়– স্টাইলে লেখা । বিদিশা বান্ধবীদের সাথে কলেজ থেকে বের হচ্ছিল । রুদ্রনীল বিদিশার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল । কোনও কথা না বলে বিদিশার ডান হাতে প্রেমপত্রটি গুঁজে দিয়ে দ্রুত চলে গিয়েছিল ।
দু’দিন বিদিশা কলেজে আসেনি । তিনদিনের দিন কলেজে এসেছিল । চোখ –মুখ লাল । রুদ্রনীলকে বন্ধু রজতাভর সাথে আসতে দেখে কলেজ গেটের সামনে বিদিশা রুদ্রনীলের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে পড়েছিল । ভয়ানক রেগে বলেছিল , “রুদ্রনীল , কী আজেবাজে কথা লিখেছ চিঠিতে । আমি এসব প্রেম-টেম করতে পারব না । আমি কলেজে এসেছি পড়াশোনা করতে । আমি শুধু পড়াশোনা করতে চাই । আশা করি, দ্বিতীয়বার এমন আর করবে না ।”
এরপর রুদ্রনীল আর বিদিশাকে বিরক্ত করেনি ।দু’জনে ভাল বন্ধু হয়ে গিয়েছিল । সেই রুদ্রনীল চুপচুুুুপ করে গোপনে কবে যে তার দেহে বাসা গেড়েছে বিদিশা তা বুঝতে পারেনি ।
প্রেমের বন্ধনে বাঁধা পড়ে গিয়েছিল দু’জনে । প্রেমে বিভোর । একদিন দেখা না হলে মনে তোলপাড় শুরু হয়ে যায় । ছেলেদের বীরত্ব মেয়েদের আকৃষ্ট করে, ভাল লাগে । তবে প্রেমে পড়লে প্রেমিকের সেই বীরত্ব প্রেমিকার মনে ভয় সঞ্চার করে । রুদ্রনীল–বিদিশার ক্ষেত্রেও এমন হয়েছিল । রুদ্রনীলের বাইক চালানো বিদিশার ভাল লাগত । প্রেমে পড়ার পর সেই বাইক চালানো নিয়ে বিদিশার ভিতর ভীতি সৃষ্টি হয়েছিল । একদিন একান্তে বিদিশা বলেছিল, “রুদ্রনীল, তুমি বাইক চালানো ছেড়ে দাও ।আমার বড্ড ভয় হয় ।”
রুদ্রনীল বিদিশার মুখে নিজের হাত চেপে বলেছিল, ” চুপ । একদম চুপ । আমার কিচ্ছু হবে না ।”

রাতে ঘুম হল না ঠিকমতো । অনিকেত তরফদারকে পরীক্ষা করার সময় বাড়ির ঠিকানা জিজ্ঞেস করেছিল । অনেক চেষ্টা করে সেটা মনে করল বিদিশা । রেনুকা এখানকার মেয়ে । সকালে কাজে এলে রেনুকার কাছে দানগ্রাম সম্পর্কে বিস্তারিত ভাবে জেনে নিল । প্রাইভেট গাড়িটি নিয়ে বিদিশা রওনা দিল হরিরামপুরের দানগ্রামে । বাড়ি খুঁজে পেতে বেশি দেরি হল না । একজনের কাছে জিজ্ঞেস করতেই দেখিয়ে দিল অনিকেতের বাড়ি , “ওই যে সাদা– রংয়ের একতলা পাকা বাড়ি । রাস্তার ধার ঘেষা । ওইটি অনিকেতের বাড়ি ।” অনিকেত তরফদারের বাড়ির সামনে গিয়ে দাঁড়াল ডক্টর বিদিশার গাড়ি । গাড়ির আওয়াজে বেরিয়ে এল অনিকেত ও অনুরাধা । “ম্যাডাম ,আপনি এখানে ! আমাদের বাড়িতে ! কী ব্যাপার ?”
“এসেছি একটা দরকারে ”
“কী দরকার ম্যাডাম ?”
“দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হবে না । ভিতরে একটা জায়গায় বসি ।”
” আসুন ম্যাডাম, বাড়ির ভিতর আসুন ।”
অনিকেত ও অনুরাধা ডক্টর বিদিশাকে ঘরের ভিতর নিয়ে গেল । চেয়ার এগিয়ে দিল অনুরাধা । ডক্টর বিদিশা চেয়ারে বসল । অনিকেতের সাত বছরের ছোট্ট ছেলে অঙ্কিত পড়াশোনা করছিল । বিদিশা কাছে ডেকে অঙ্কিতকে আদর করল । অনিকেত দাঁড়িয়েছিল । ডক্টর বিদিশা তাকে চেয়ার নিয়ে সামনে বসতে বলল । চা– বিস্কুট নিয়ে এল অনুরাধা । সঙ্গে মিষ্টি । মিষ্টি খাওয়ার পর চা খেতে –খেতে ডক্টর বিদিশা প্রশ্ন করল, ” অনিকেতবাবু , আপনার একটি চোখ প্রতিস্থাপন করা মানে লাগানো চোখ । ঘটনাটা কী বলা যাবে ? মানে কীভাবে আপনার একটি চোখ নষ্ট হয়েছিল ?”

“বাড়ি থেকে বেশ কিছুটা দূরে আমার দোকান । আমার দোকানের কয়েকটা দোকান পরে কর্মকারের দোকান । কর্মকারের দোকানের সামনে পলিথিন পেতে তাস খেলা চলছিল । কর্মকার হাতুড়ি দিয়ে লোহা পিঠছিল।
বিকেলবেলা । দোকানে খদ্দের ছিল না । আমি দোকান ছেড়ে টুুুুল নিয়ে বসে তাস খেলা দেখছিলাম । কর্মকারের দোকান থেকে একটি ছোট লোহার টুকরো আমার চোখে এসে লেগেছিল । চোখ দিয়ে রক্ত ঝরছিল । আমার একটি চোখ নষ্ট হয়ে গিয়েছিল।”
“খুবই দুঃখজনক । তারপর ?”
” আমি বিভিন্ন ডাক্তারের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলাম । তারা বলেছিল, “আমি চোখ লাগাতে পারি । আমার এক পিসতুতো দাদার মাধ্যমে এক এনজিও–র সাথে যোগাযোগ হয়েছিল । সেই এনজিও–র সহায়তায় আমি একটি চোখ লাগিয়েছি ।”

ডক্টর বিদিশা চক্ষুদাতার নাম জিজ্ঞেস করল না । কারণ সে জানে , চক্ষুদাতার নাম অজ্ঞাত রাখা হয় ।
ডক্টর বিদিশা জিজ্ঞেস করল, ” আচ্ছা, সেই এনজিও কি রায়গঞ্জের ? ”
“হ্যাঁঁ ম্যাডাম ।” অনিকেত উত্তর দিল ।
“এনজিও–এর নাম কী ?”
“আলো।”
ডক্টর বিদিশা অনিকেতের চোখের দিকে তাকাল । ভাল করে পরখ করল । আরে, এতো রুদ্রনীলের চোখ । ডক্টর বিদিশা বুঝল, অনিকেতের ডান চোখটি রুদ্রনীলের ।
ছিঃ, ছিঃ,ছিঃ । সেদিন কেন রুদ্রনীলের চোখকে আমি চিনতে পারিনি ! যে –চোখে চোখ রেখে বহু দিন কেটেছে আমাদের দু’জনার, যে–চোখে চোখ রেখে স্বপ্নে হারিয়ে যেতাম আমরা, সেই চোখকে আমি চিনতে পারলাম না ! অনুশোচনায় ভরে গেল ডক্টর বিদিশার মন । তবে অনুশোচনার সঙ্গে সঙ্গে প্রাপ্তির একটা সুখানুভূতি খেলতে লাগল ডক্টর বিদিশার শরীর জুড়ে ।
চা-বিস্কুট খাওয়া শেষ করে ডঃ বিদিশা বলল, “ঠিক আছে । আজ আসি । পনেরো দিন পর আপনারা আমার কাছে আসুুুুন । আমি তাড়াতাড়ি আপনাদের অপারেশনের তারিখ দিয়ে দেব ।”
অনিকেত বলল, ” ম্যাডাম, একটা কথা বলব মনে কিছু করবেন না তো ?”
” না । বলুন ।”
” ম্যাডাম , আমার স্ত্রী অনুরাধা আমার চোখ দুটোকে খুব ভালবাসে । সে বলে, আমার দু-চোখে নাকি তীব্র আকর্ষণ রয়েছে । জাদু আছে আমার দু’চোখে । তাই অপারেশনটা যদি খুব যত্ন দিয়ে করেন, তাহলে অনুরাধা খুব খুশি হয় ।”
” অপারেশন নিয়ে আপনাদের দুশ্চিন্তা করতে হবে না । ভয়ের কোনও ব্যাপার নেই । আমার ওপর আপনারা সম্পূর্ণ ভরসা করতে পারেন ।”
গাড়ি স্টার্ট দিয়ে বেরিয়ে গেল ডাক্তার বিদিশা।

রুদ্রনীল হেমতাবাদ তার এক বন্ধুর বাড়ি থেকে ফিরছিল । বাংলা বন্ধ । ফাঁকা রাস্তা । গাড়ি-ঘোড়া নেই । ছুটির মেজাজ । রাস্তার পাশে এখানে-ওখানে ক্রিকেট খেলা, ফুটবল খেলা চলছিল । বেশ জোরে চলছিল রুদ্রনীলের বাইক । রাস্তার পাশে কয়েকজন ছেলে মিলে ফুটবল খেলছিল । ফুটবল খেলতে খেলতে ফুটবলটি রাস্তার মাঝে একেবারে রুদ্রনীলের বাইকের সামনের চাকার সামনে চলে এসেছিল । নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রুদ্রনীলের বাইক রাস্তার পাশে এক পাকা বাড়ির দেওয়ালে ধাক্কা মেরেছিল । স্পট ডেথ । আশপাশের যুবক ছেলেরা রুদ্রনীলকে হাসপাতালে নিয়ে গেলে ডাক্তাররা তাকে মৃত বলে ঘোষণা করেছিল । হাসপাতালে ছুটে গিয়েছিল বিদিশা । শেষ কথা হয়নি তাদের ।
রুদ্রনীল বলত, চোখ ক্যামেরার মতো ।ক্যামেরায় তোলা ছবি যেমন নেগেটিভ অবস্থায় থাকে, ওয়াশ করলে ছবি বেরিয়ে পড়ে, তেমনই চোখের মধ্যে গৃহীত ছবি নেগেটিভ অবস্থায় সঞ্চিত থাকে, ওয়াশ করলে ছবি বেরিয়ে আসে ।
রুদ্রনীল তার চোখ দু’টি দান করে গিয়েছিল ‘আলো’ নামে এক এনজিও-র কাছে ।রুদ্রনীলের চোখ দু’টি ছিল সুন্দর । পদ্মের মতো ।মারা যাওয়ার চার ঘণ্টার মধ্যে চক্ষু গ্রহণ করতে হয় । ঠিক সময়ের মধ্যে এসে এনজিওর সদস্যরা রুদ্রনীলের চোখ দু’টি নিয়ে গিয়েছিল ।

ইতিমধ্যে জয়েন্ট এন্ট্রান্সের ফল বের হয়েছিল ।ডাক্তারিতে পাশ করেছিল বিদিশা । কলকাতায় ডাক্তারি পড়তে চলে গিয়েছিল সে ।

ডক্টর বিদিশা বুনিয়াদপুর–চেম্বারের ভিতরে চেয়ারে বসে চেম্বারের দরজার দিকে তাকিয়ে দূর থেকে বলে উঠল, ” আসুন, আসুন। বসুন ।”
অনিকেত ও অনুরাধা পাশাপাশি এগিয়ে গেল টেবিলের দিকে । ‘নমস্কার’ জানিয়ে তারা চেয়ারে বসল । ডক্টর বিদিশাও নমস্কার জানাল । ডক্টর বিদিশা বলল, ” বলুন অনিকেতবাবু , নতুন কোনও সমস্যা ?”
“না ম্যাডাম । আমরা এসেছি আপনার সঙ্গে দেখা করতে । আপনি বলেছিলেন পনেরো দিন পর দেখা করতে । সেইদিনই আপনি আমার অপারেশনের তারিখ দেবেন ।” অনিকেত প্রেসক্রিপশন বের করে দিল ।
“হ্যাঁঁ, হ্যাঁঁ । ঠিক করেছেন । ভাল করেছেন ।” ডক্টর বিদিশা আগামি পনেরো দিনের অপারেশনের তালিকা দেখল । তারিখ বের করে বলল, ” শুনুন অনিকেতবাবু, আগামি পরশু আপনার অপারেশনের তারিখ । সেই তারিখে আসুন ।অপারেশন হবে গঙ্গারামপুর হাসপাতালে । প্রথমে অপারেশন হবে আপনার বা’চোখে । কী, মনে থাকবে তো অপারেশনের তারিখ ?”
“হ্যাঁ ম্যাডাম ।
“এই নিন । অপারেশনে তারিখ প্রেসক্রিপশনে লেখা রইল ।” ডক্টর বিদিশা প্রেসক্রিপশন তুলে দিল অনিকেতের হাতে ।
প্রেসক্রিপশন হাতে নিয়ে নমস্কার জানিয়ে চেম্বার থেকে বের হয়ে এল অনিকেত ও অনুরাধা ।

চোখের ছানির অনেক অপারেশন করেছে ডক্টর বিদিশা । কোনও অভিযোগ নেই । সকলে বলে, খুব যত্ন–সহকারে দায়িত্ব নিয়ে অপারেশন করে ডক্টর বিদিশা । সময়ের অনেক আগে গঙ্গারামপুর হাসপাতালে নির্দিষ্ট দিনে পৌঁছে গেল অনিকেত ও অনুরাধা । অনেকেক্ষণ ধরে বসে থাকল দু’জনে । হাসপাতালে এল ডক্টর বিদিশা । কিছু সময় পর অপারেশন থিয়েটারে ডাক পড়ল অনিকেতের । ওটি–র অভিমুখে এগিয়ে চলল অনিকেত । অনুরাধা করুণ চোখে তাকিয়ে রইল অনিকেতের দু’চোখের দিকে । দু’জনে বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল একে –অপরের চোখের দিকে । ওটি–র ভিতর প্রবেশ করল অনিকেত । অনুরাধা বাইরে বসে অপেক্ষা করতে লাগল । ছেলেকে সাথে আনেনি
। ছেলেকে রেখে এসেছে তার মাসির বাড়িতে ।
অনুরাধার বুকের ভিতর শব্দ শুরু হল ধক,,,,,ধক,,,,ধক,,,,,,
অনিকেতকে অপারেশন টেবিলে শুইয়ে দিল ডক্টর বিদিশা । বা’চোখ অবশ করল অনিকেতের । ডান চোখে যাতে চাপ না পড়ে , সেজন্য ডান চোখটি বন্ধ করে দিল । অপারেটিং –মাইক্রোস্কোপে চোখ রাখল ডক্টর বিদিশা । অপারেশন শুরু করল ।

ঘড়ি চলতে লাগল । ঘড়ির সেকেন্ডের কাঁটা মিনিটের কাঁটার সাথে ছি–বুড়ি খেলতে লাগল । সেকেন্ডের কাঁটা ঘন ঘন মিনিটের কাঁটাকে ছি–বুড়ি খেলার মতো এসে ছুঁয়ে যাচ্ছিল । কাঁটা দু’টির কোনও খেয়াল নেই , কোনও দয়া মায়া নেই অনুরাধার প্রতি । অনেকক্ষণ ধরে চলল ওদের মধ্যে এমন ছি–বুড়ি খেলা আর অনুরাধার বুকের মধ্যে চলছিল ধক,,,,,,ধক,,,,,ধক,,,,,,,,
অপারেশন থিয়েটার থেকে বেরিয়ে এল ডক্টর বিদিশা । অনুরাধা উঠে দাঁড়াল । হাসিমুখে ডক্টর বিদিশা জানাল, ” ভয় নেই । অপারেশন সাকসেসফুল ।” অনুরাধার মুখে হাসি ফুটে এল । ডক্টর বিদিশা বলল, ” ওনার চোখে নতুন লেন্স লাগানো হয়েছে । আইপ্যাড দিয়ে চোখ ঢাকা রয়েছে । ওনাকে এখানে দু’দিন দেখে ছেড়ে দেব । দু’দিন পর চোখ থেকে আইপ্যাড খুলে নেওয়া হবে । রাতে চোখে আইগার্ড লাগিয়ে ঘুমোতে হবে । চোখে যাতে ধুলো–বালি ও সূর্যের আলো না পড়ে, সেজন্য চোখে লাগিয়ে থাকতে হবে কালো চশমা ।

দু’মাস পর ডান চোখের অপারেশনের তারিখ পড়ল । অনুরাধা সঙ্গে এল । অপারেশন থিয়েটারে ডাক পড়ল অনিকেতের । অনেকক্ষণ অনিকেত ও অনুরাধার মধ্যে দৃষ্টি বিনিময় হল । অনুরাধা বাইরে বসে অপেক্ষা করতে লাগল । অনুরাধার বুকের ভিতর শব্দ শুরু হল ধক,,,,,ধক,,,,,ধক,,,,,,
ডক্টর বিদিশা এসে সুখবর দিল, ” অপারেশন সাকসেসফুল । ডান চোখে নতুন লেন্স লাগানো হয়েছে ।”

ঠক, ঠক, ঠক । সদর দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ ।
ভিতর থেকে সাড়াশব্দ এল না । কী ব্যাপার !কেউ কী নেই ! কোথায় গেল সব ? বাইরে কোথাও যায়নি তো ? অসুস্থ হয়ে পড়েনি তো ?অনেকক্ষণ হয়ে গেল ডক্টর বিদিশা দরজায় দাঁড়িয়ে । অপারেশনের এক মাস হয়ে গেছে ।দেখা করতে এসেছে ডক্টর বিদিশা । মদনকে বলে এসেছে আজ সে চেম্বারে বসবে না । গাড়ি থেকে নেমে দেখল, সদর দরজা বন্ধ । কেউই এগিয়ে এল না অভ্যর্থনা জানানোর জন্য । মনে হল, বাড়িতে কেউ নেই । বিদিশা প্রথমে কলিং –বেল বাজিয়ে ছিল । কলিং –বেল বোধহয় খারাপ ছিল । আওয়াজ হয়নি । দরজায় দুটো লোহার বালা লাগানো । ডক্টর বিদিশা বালা ধরে কড়া নাড়ল । এই অসময়ে ঘুমিয়ে থাকার কথা নয় । কী ব্যাপার ? আবার কড়া নাড়ল
—-ঠক, ঠক, ঠক
কোনও সাড়া নেই । আশপাশে কাউকে দেখা গেল না যে, জিজ্ঞেস করবে । না । আর থাকা নয় । এই শেষবার । ডক্টর বিদিশা জোরে– জোরে কড়া নাড়ল । ভিতর থেকে আওয়াজ এল, “কে ?”
“আমি ।”
“আমি কে ?”
“ডক্টর বিদিশা ।”
” এ মা আপনি ! অনুরাধা দ্রুত দরজা খুলল ।” সরি , ম্যাডাম সরি , মাফ করবেন । আমাদের বাড়ির পিছনদিকে মোটর চালিয়ে পুকুর শুকানো হচ্ছে । আমি ওখানে ছিলাম । জেনারেটরের শব্দে কিছু শুনতে পাইনি । গাড়ির আওয়াজ কানে আসেনি । গরম লাগছিল । ভিতরে এসেছিলাম হাত–পাখা নিতে । এসে সদর দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ পাই । কিছু মনে করবেন না ম্যাডাম । “চেয়ারে এগিয়ে দিল অনুরাধা
“না ,না । ঠিক আছে । অত চিন্তার কিছু নেই । এমনটা হতেই পারে । অনিকেতবাবু কোথায় ?” ডক্টর বিদিশা চেয়ারে বসল ।
“ওখানে । পুকুরপাড়ে বসে জল শুকানো দেখছে । আমি ডেকে আনছি ।”
অনুরাধা চলে গেল । অল্প সময়ের মধ্যে অনিকেত তাড়াহুড়ো করে এসে হাজির হল । ‘সরি ম্যাডাম ,সরি । বুঝতে পারিনি আপনি এসেছেন ।”
“ঠিক আছে, ঠিক আছে । এটা নিয়ে ভাববেন না ।”
অনিকেত হাত –পা ধুতে বাথরুমে ঢুকল । পরিষ্কার হয়ে চেয়ারে বসল ।
অনিকেতের ছেলে অঙ্কিত উঁকিঝুঁকি মারছিল । ডক্টর বিদিশা ব্যাগে করে কিছু খাতা –কলম –বই এনেছিল অনিকেতের ছেলে অঙ্কিতকের জন্য । বিদিশা হাত নেড়ে কাছে ডেকে অঙ্কিতকের হাতে সেগুলো তুলে দিল ।
অনুরাধা চা নিয়ে এল । ডক্টর বিদিশা চায়ের কাপে চুমুক দিল ।

অনিকেত খেয়াল করল, তার ডান চোখটি লাফাচ্ছে । ডক্টর বিদিশাকে দেখার পর থেকে চোখটা লাফাচ্ছে । কী ব্যাপার ! ডানচোখ লাফাচ্ছে কেন ? এমন তো হয় না । হাত দিয়ে চোখটিকে কচলাল অনিকেত । তবু লাফানো থামল না । কী ব্যাপার ! লাফানো থামছে না কেন ! কোনমতেই লাফানোতে রাশ টানতে পারছে না অনিকেত । অনিকেত মনে বলল , “চোখে তো কিছু পড়েনি, তবে এমন লাফাচ্ছে কেন ? এতক্ষণ পুকুরপাড়ে বসেছিলাম, তখন তো চোখ লাফায় নি। তবে এখন কেন ডক্টর বিদিশাকে দেখার পর চোখ লাফাচ্ছে ! চোখের যদি সমস্যা হতো , তাহলে আগেও দু-একবার চোখ এমন লাফাত। তেমন তো ঘটনা এতদিন ঘটেনি ।
রাতে ঘুম না হলে, মাদকদ্রব্য সেবন করলে চোখ লাফাতে পারে । সেরকম তো কোন কিছুই হয়নি । রাতে ঠিকমতো ঘুম হয়েছে, মাদকদ্রব্য আমি কোনদিন খাই না । তবে কেন চোখ লাফাচ্ছে ! অনিকেতের মাথায় কিছু ঢুকল না ।”
কী খেয়াল হলো ডক্টর বিদিশা চেয়ার ছেড়ে এসে অনিকেতের পাশে দাঁড়িয়ে চা খেতে লাগল । ডক্টর বিদিশা অনিকেতের পাশে গিয়ে দাঁড়াতেই অনিকেতের চোখ লাফানো বন্ধ হয়ে গেল । দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই ডক্টর বিদিশা জিজ্ঞেস করল, ” অনিকেতবাবু, কেমন আছেন ?” অনিকেত উত্তর দিল, ” ভাল আছি ম্যাডাম ।”
ডক্টর বিদিশা ফিরে এসে চেয়ারে বসল । চা-খাওয়া শেষ করে কাপটা পাশে রেখে অনিকেতের সামনে গিয়ে দাঁড়াল ।
অনিকেতকে জিজ্ঞেস করল, ” অনিকেতবাবু , আমায় দেখতে পাচ্ছেন ?”
” হ্যাঁ,ম্যাডাম ।”
“সম্পূর্ণভাবে দেখতে পাচ্ছেন ?”
“হ্যাঁ ।”
” আমাকে ঝাপসা ঝাপসা লাগছে না তো ?”
“না, ম্যাডাম ।”
“অস্পষ্ট লাগছে না তো ?”
” না ।”
আবার ডক্টর বিদিশা জিজ্ঞেস করল, ” অনিকেতবাবু, বলুন তো আমি কী পরেছি ?”
“শাড়ি ।”
” কী রঙের ?”
“খয়েরি রঙের ।”
ডক্টর বিদিশা বলল , ” অনিকেতবাবু ,বলুন তো আমার কপালে কী ?”
” একটি গোলাকার টিপ ।”
” কী রঙের ?”
” লাল রঙের ।”
” আমার চুলে কী লাগানো ?”
“ক্লিপ ।”
” বলুন তো আমার গালের বাঁদিকে কালো এটা কী ?”
” তিল ।”
” ঠিক । একদম ঠিক ।” আনন্দে ভরে গেল ডক্টর বিদিশার শরীর । মনের ভিতর ময়ূর নাচতে লাগল । সারা দেহে ছড়িয়ে পড়ল খুশির জোয়ার । কোকিলের ডাক শোনা যেতে লাগল দেহের মধ্যে । চেয়ারে গিয়ে বসল ডক্টর বিদিশা । চোখে–মুখে প্রশান্তি । কিছু সময় চেয়ারে বসে ডক্টর বিদিশা অনিকেত ও অনুরাধাকে বলল, “শুনুন, চোখ হচ্ছে মনের দর্পণ । মনের কথা ফুটে ওঠে চোখে । চোখের ভাষা রয়েছে । ভাল করে চোখের দিকে তাকালে সেই ভাষা বোঝা যায় । মন দিয়ে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলে সেই ভাষা পড়া যায় । চোখ নিয়ে অবহেলা করবেন না ।চোখে ধুলো –বালি –ময়লা যাতে না পড়ে, সেদিকে খেয়াল রাখবেন । প্রতিদিন দু ‘চোখ জল দিয়ে ভাল করে পরিস্কার করবেন । রোদে চশমা পড়বেন । খালি চোখে সূর্যের দিকে তাকাবেন না । খুব কাছ থেকে টিভি দেখবেন না । চোখে কোনও রকম সমস্যা দেখা দিলে সরাসরি কোনও চক্ষুবিশেষজ্ঞের সঙ্গে দেখা করবেন । কী, মনে থাকবে তো ?”
“হ্যাঁ ,ম্যাডাম ।”
“তাহলে আজ আসি ।” ডক্টর বিদিশা উঠে দাঁড়াল । তারপর নিজের গাড়িতে গিয়ে বসল । গাড়ি স্টার্ট দিল ।

‘ইন্ডিকা’ চলছে । ডক্টর বিদিশা ফিরে চলেছে ।শরীরে তার সুখানুভূতি । কেন জানিনা, দান গ্রামের আকাশ– বাতাস– মাটি –জল–মানুষ খুব ভাল লাগছে তার । এখানকার বাতাসে গা ভিজিয়ে নিতে ইচ্ছে করছে । রাস্তাঘাট এখানে ভাল নয় । মাঝে– মাঝে গর্ত । এবড়ো খেবড়ো । তবু রাস্তাগুলো তার মনে খুশি এনে দিচ্ছে । মাঝে–মধ্যে পুকুর । পুকুরে খেলারত হংস–হংসী ডক্টর বিদিশাকে মুগ্ধ করল । খুশিতে ভরে উঠল তার মন । এখানে বিশেষ কিছু নেই । আকাশচুম্বী বাড়ি নেই, ট্রেন নেই, বিমানঘাঁটি নেই, সুদৃশ্য পার্ক নেই । রয়েছে কিছু সাধারণ বাড়িঘর, ছোটখাটো কিছু দোকান । এই দোকান , বাড়ি–ঘরগুলো খুব পছন্দ লাগছে ডক্টর বিদিশার ।
গাড়ি দানগ্রাম ছাড়িয়ে হরিরামপুর– মোড়ে বাঁক নিয়ে কুশকারি রাস্তায় উঠল । ফাঁকা রাস্তা ।পকেট রুট । রাস্তার দু’দিকে সারি –সারি সবুজ গাছ । আশপাশে তালগাছ ,খেজুর গাছ । এদিক-ওদিক দেখা যাচ্ছিল কিছু অসম্পূর্ণ বাড়িঘর । কিছুদিন আগে ঘূর্ণিঝড় হয়েছিল এদিকে । ঝড়ে অনেকের বাড়ির চাল উড়ে গিয়েছিল, দেওয়াল ভেঙে গিয়েছিল । খুঁটি দিয়ে সেই ঘরগুলোর কাঠামো তৈরি হয়ে রয়েছে, ঘর তৈরি হয়নি । ডক্টর বিদিশা ঘরগুলোর দিকে তাকিয়ে রইল ।

গাড়ি বেশ জোরে চলছিল । গাড়ি অনিকেত– অনুরাধার বাড়িকে বেশ অনেকটা দূরে রেখে ধুমসাদিঘিতে এসে গঙ্গারামপুর—মালদা রোডে উঠল । গাড়ি গঙ্গারামপুরের দিকে ছুটতে লাগল । হাওয়াতে বেশ কিছু চুল এসে পডেছিল বিদিশার মুখের ওপর । এক হাতে স্টিয়ারিং ধরে অন্যহাতে চুলগুলো সরিয়ে দিল বিদিশা । লুকিং–গ্লাসে দেখে নিল তার বাঁ গালের কালো তিলটা ।

গাড়ি দানগ্রামকে অনেকটা পিছনে ফেলে এগিয়ে চলল গঙ্গারামপুরের দিকে । ডক্টর বিদিশা বলে উঠল, ” অনিকেত, ভাল থেকো । স্ত্রী-ছেলে নিয়ে সুখে থেকো । আনন্দে ঘর-সংসার করো । তোমার দু’চোখ দিয়ে তুমি পৃথিবীকে দেখো, পৃথিবীর রূপ উপভোগ করো, পৃথিবীকে সুন্দর করে তৈরি করো । আর মাঝে –মধ্যে আমাকে দেখো, বিদিশাকে দেখো ।”

সমাপ্ত

লেখাটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো লেখা
© ২০২১ বাংলার কথা । এম.ও. টেলিকম কর্তৃক সর্বস্বত্ত্ব স্বত্ত্বাধিকার সংরক্ষিত
Theme Customized BY LatestNews